শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে ব্লকচেইন (Blockchain to enhance transparency in the education sector)

Published in: The Daily Samakal Date: September 02, 2025


Read on The Daily Samakal

দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যখন একাডেমিক অখণ্ডতা ও আস্থা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন ব্লকচেইন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি সাধারণত ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেও শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। শিক্ষাক্ষেত্রে ভুয়া ডিগ্রি, সনদপত্র ও একাডেমিক রেকর্ড জালিয়াতি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বাংলাদেশেও এই সমস্যা হরহামেশা দেখা যাচ্ছে। নকল সনদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং প্রকৃত ডিগ্রিধারীদের মূল্য হ্রাস করে। ব্লকচেইন প্রযুক্তি এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ব্লকচেইনে ডিগ্রি, সনদপত্র এবং ট্রান্সক্রিপ্ট ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করতে পারে, যা অপরিবর্তনীয় হওয়ায় জাল করা সম্ভব নয়। নিয়োগকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ ব্লকচেইনের মাধ্যমে সনদের সত্যতা তাৎক্ষণিক যাচাই করতে পারে, যা ম্যানুয়াল যাচাই প্রক্রিয়ার সময় ও জটিলতা হ্রাস করে। উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার্থীদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্থানান্তর এখন একটি সাধারণ বিষয়। তবে ক্রেডিট ট্রান্সফার, ডিগ্রি যাচাই এবং একাডেমিক রেকর্ড শেয়ারিং প্রক্রিয়া প্রায়ই জটিল ও সময়সাপেক্ষ। ব্লকচেইন এই প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে। শিক্ষার্থীর একাডেমিক ইতিহাস ব্লকচেইনে একটি যাচাইযোগ্য, ডিজিটাল ফরম্যাটে সংরক্ষিত থাকবে, যা বিশ্বের যে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা নিয়োগকর্তা সহজে অ্যাকসেস করতে পারবে।

ব্লকচেইন ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে, যা বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে অংশীদারিত্বের সুযোগ বাড়াবে। প্রথাগতভাবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক রেকর্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে, যা শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। ব্লকচেইন এই গতানুগতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কার সঙ্গে তাদের রেকর্ড শেয়ার করতে হবে এবং কতটুকু তথ্য প্রকাশ করা হবে। এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষমতায়ন এবং তাদের শিক্ষাগত যাত্রায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা প্রদান করবে।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা ব্যাপক হলেও বাংলাদেশে এর বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ব্লকচেইন বাস্তবায়নের জন্য উচ্চগতির ইন্টারনেট, আধুনিক হার্ডওয়্যার এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন, যা গ্রামীণ এলাকায় সীমিত। শিক্ষক, প্রশাসক এবং প্রযুক্তিবিদদের ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখতে শক্তিশালী ডেটা গোপনীয়তা নীতি ও ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রটোকল প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে ব্লকচেইন সিস্টেম স্থাপনের জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন। সমাধান হিসেবে প্রথমে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্লকচেইনভিত্তিক সনদপত্র ইস্যু করার পাইলট প্রকল্প শুরু করা যেতে পারে।

সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। খরচ কমাতে ওপেন-সোর্স ব্লকচেইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের তথ্য সুরক্ষার জন্য জিডিপিআরের মতো আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করা উচিত।

বাংলাদেশে ব্লকচেইন প্রযুক্তির প্রয়োগ একটি বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা। বিশ্বব্যাপী বেশ কিছু উদাহরণ ইতোমধ্যে এর কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশে প্রথম ধাপে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদপত্র ডিজিটালাইজেশন শুরু করা যেতে পারে। এর পর ধীরে ধীরে রেজিস্ট্রেশন, ফল প্রকাশ এবং ক্রেডিট ট্রান্সফারের মতো ক্ষেত্রে ব্লকচেইন প্রয়োগ সম্প্রসারিত করা সম্ভব। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।